বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ বক্তা সম্রাট গোলাম আহামদ মোর্তজা সাহেব আর নেই

বেতার বার্তা ডিজিটাল ডেস্কঃ নুর মোহাম্মদ খান, বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও বাগ্মী জনাব হাফেয গোলাম আহমাদ মোর্তজা সাহেব, ইন্তেকাল করেছেন (ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহে রাজেউন)

স্বাধীনতাত্তোর ভারতবর্ষে স্কুল-মাদ্রাসা সহ কলেজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যে ইতিহাস পড়ানো হয় সেই সমস্ত ইতিহাস গ্রন্থ গুলি সংখ্যাগুরুদের তোষণ করে লেখা। এবং ইতিহাস গুলি বিকৃত। বিদেশি ইংরেজি সহ অন্য ভাষায় লেখা ইতিহাস দ্বারা তাহা প্রমাণিত। দেশ-বিদেশের বহু ইতিহাসের গ্রন্থ থেকে উদ্বৃতি এবং অনুবাদ করে বাংলা ভাষায় ভারতের সঠিক ইতিহাস সর্ব প্রথম মানুষের সামনে তুলে ধরেন বর্ধমান মেমারি বিশিষ্ট ইতিহাসবিদ ও বাগ্মী জনাব হাফেয গোলাম আহমাদ মোর্তজা সাহেব। আজ বৃহস্পতিবার ২ রমাযান, ১৫ এপ্রিল ২০২১ ভোর ০৩:৩৫ মিনিটে ইন্তেকাল করেছেন। বয়সজনিত বিভিন্ন সমস্যায় তিনি জিডি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যু বরন করেন।( ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজেউন)। মৃত্যুকালে মরহুমের বয়স হয়েছিল ৮৩ বছর। রেখে গেছেন ৬ পুত্র,এক কন্যা ও অসংখ্য ভক্ত ও অনুসারী।

পশ্চিমবাংলা, বাংলাদেশসহ গ্রামবাংলায় ইসলামিক ধর্মসভা গুলি হয় সেই সভায় কোরআন হাদিস নিয়ে আলোচনা করা হয়। গোলাম মোর্তজা সাহেব সর্বপ্রথম ইসলামিক ধর্ম সভা গুলিতে কোরআন হাদিসের সাথে সাথে সঠিক ভারতীয় ইতিহাস সম্বন্ধে মানুষের সামনে তুলে ধরেন। এবং ধর্ম সভার সভাস্থল থেকে তার লেখা ইতিহাস মানুষকে পড়ার সুযোগ করে দেন। ধর্মসভা গুলি ছাড়াও তিনি ভারতবর্ষসহ বিভিন্ন দেশে আয়োজিত বহু সভাই তিনি ইতিহাস সম্বন্ধে বক্তব্য রাখেন।

এবং ছাত্রদের সিলেবাসে ইতিহাস গুলো যে বিকৃত তা তিনি প্রমাণ করেন। বিশিষ্ট লেখক গোলাম মোর্তোজা সাহেবের লেখা সাড়া জাগানো কয়েকটি গ্রন্থ হলো- চেপে রাখা ইতিহাস, বাজেয়াপ্ত ইতিহাস, ইতিহাসের ইতিহাস, এ এক অন্য ইতিহাস, পুস্তক সম্রাট, রক্তাক্ত ডায়েরি, বর্জ্র কলম, ইতিহাসের এক বিস্ময়কর অধ্যায়, এ সত্য গোপন কেন? উল্লেখযোগ্য ইতিহাসের ইতিহাস’ বইটি পশ্চিমবঙ্গে বামফ্রন্ট সরকার জ্যোতি বসু ১৯৮১ সালে বাজেয়াপ্ত ঘোষণা করে। এছাড়াও তিনি গবেষণামূলক বহু গ্রন্থের প্রণেতা। তার লেখা প্রতিটি গ্রন্থ তথ্যসমৃদ্ধ, সকল গ্রন্থ গুলিতেই তথ্যসূত্র হিসাবে পৃথিবীর বড় বড় ঐতিহাসিক দের ইতিহাস গ্রন্থের রেফারেন্স দেওয়া। ইতিহাসকে নতুন আঙ্গিকে সাজিয়ে হিন্দু-মুসলমান সম্প্রীতি এবং মিলনের ক্ষেত্রে অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।

ইতিহাসবিদ আল্লামা গোলাম আহমাদ মোর্তজা: ইনি হলেন সেই মহান ব্যাক্তি গোলাম আহমদ মোর্তাজা যার বই এবং বক্তব্যের মাধ্যমে মানুষ হাজারো ইতিহাস জানতে পেরেছে। গোলাম আহমাদ মোর্তজা জন্ম বর্ধমান জেলার মেমারিতে। তিনি একজন বক্তা,গবেষক ও লেখক। তিনি দুই বাংলার অর্থাৎ ভারত বাংলাদেশের পাঠকদের কাছে সমানভাবে জনপ্রিয়।

ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে যেমন পলাশীর যুদ্ধ,অন্ধকূপ হত্যাকান্ড, মহামতি আকবরের কথা এমনি অনেক নতুন তথ্য তিনি প্রমাণসহ পেশ করেন। যা আসলে আমরা যেভাবে জানি সেভাবে বলা হয়নি। তাঁর পুস্তক পাঠে বিশ্বাস অবিশ্বাসের দোলাচলে পড়ে যায় পাঠক, কিন্তু গোলাম আহমাদ মোর্তজা এমনভাবে তথ্য উপাত্ত উপস্থাপন করেছেন। তাতে তাকে মেনে নিতে হয়েছে ভারতের বর্তমান ঐতিহাসিকদের। বিখ্যাত ইতিহাসবিদরা তার তথ্য মেনে নিয়েছেন এবং প্রশংসা করেছেন।

ইতিহাসের অনেক বিখ্যাত ব্যক্তিদের সম্পর্কে তথ্য দেন যা চাপা পড়ে ছিলো ইতিহাসের পাতায়। তিনি সেগুলোকে সামনে তুলে আনার চেষ্টা করেন। তাকে নিয়ে এ পর্যন্ত অনেক বিতর্কের সৃষ্টি হয়। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় তিনি বক্তব্য দিয়ে থাকেন এবং তিনি “বক্তা সম্রাট’ নামে পরিচিত। তিনি বিখ্যাত হয়েছেন তাঁর কয়েকটি ইতিহাসের বই ও ইতিহাস ভিত্তিক বিতর্কিত বক্তব্যের মাধ্যমে। ইতিহাসের ইতিহাস, চেপেরাখা ইতিহাস,বাজেয়াপ্ত ইতিহাস,পুস্তক সম্রাট সহ অনন্য ইতিহাসের বইয়ের মাধ্যমে তিনি সর্বপ্রথম আলোচনায় আসেন।

তিনি ছিলেন তৎকালীন যুগে স্নাতক শিক্ষাগত যোগ্যতা স্নাতক হলেও তার চিন্তা করা ছিল উচ্চ বর্তমান সময়ে বেসরকারি ধর্মীয় মাদ্রাসাগুলিতে ধর্মশিক্ষাই বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতির দিকে লক্ষ্য করে গোলাম মোর্তজা সাহেব। নিজ উদ্যোগে কিছু বেসরকারি মাদ্রাসার প্রতিষ্ঠা করেন এবং সেই মাদ্রাসাগুলিতে ধর্মীয় শিক্ষার সাথে সাথে। আধুনিক শিক্ষা এবং বৃত্তি শিক্ষা জোর দেন। তিনি মেমারি জামিয়া মাদ্রাসা ও মামুন ন্যাশনাল স্কুল সহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিষ্ঠাতা। তিনি সব সময় সকল ছাত্র-ছাত্রীদের আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার জন্য উৎসাহিত করতেন।

তার সুখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে মুসলিম ইতিহাস নিয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা বক্তৃতা দেওয়া নিয়ে। তাঁর মোহিত করা বক্তব্য রাখার জন্য তিনি সমাজে ‘বক্তা সম্রাট’ নামে পরিচিত সুখ্যাত হয়ে ওঠেন। পশ্চিমবঙ্গ, অসম ত্রিপুরা সহ বিভিন্ন রাজ্যে তিনি ‘বক্তা সম্রাট’ হিসেবে ব্যাপক জনপ্রিয় ছিলেন। স্বাভাবতই তাঁর মৃত্যুতে বাংলার আলেম সমাজে এক অপূরণীয় ক্ষতি হল।

Comments